Pre-loader logo

এলিমিনেটর ম্যাচে টার্মিনেটর গেইল

এলিমিনেটর ম্যাচে টার্মিনেটর গেইল

তাঁর টুইটার ও ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টের পরিচিতি অংশে লেখা ‘ইউনিভার্স বস’। তবে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের এবারের আসরে গতকালকের ম্যাচের আগ পর্যন্ত ক্রিস গেইলের যা পারফরম্যান্স, তাতে তাঁর বসগিরির আওতাটাকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড থেকে কমিয়ে উপজেলাপর্যায়ে নামিয়ে আনার মতো। অন্তত সাত ইনিংস ব্যাট করেছেন এমন ব্যাটসম্যানদের ভেতর সর্বোচ্চ স্ট্রাইকরেটের শীর্ষ পাঁচে ছিলেন না এই ক্যারিবিয়ান দানব। আট ইনিংসে মাত্র ২১০ রান, স্ট্রাইকরেট ১৪৫ আর ছয়ের মার ১৫টি। অর্থাৎ ম্যাচপ্রতি গড়ে দুটি ছক্কাও নয়। টি-টোয়েন্টির সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন ক্রিকেটারের এই বেহাল দশা ফিটনেসের অভাব, নাকি বিপিএলের পাগুলে উইকেটের কারণে, পরিষ্কার হচ্ছিল না রহস্যটা। কাল আবারও বোঝা গেল কেন এত এত ডলার দিয়ে নানা দেশের নানা ফ্র্যাঞ্চাইজি তাঁকে দলে টানে। অসমান বাউন্সের উইকেটে ধুঁকতে ধুঁকতে শেষ চারে ওঠা রংপুর রাইডার্সের সামনে খুলনা টাইটানসের ১৬৮ রানের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার পর নানাজনের অবজ্ঞা মেশানো ভবিষ্যদ্বাণী, ‘একমাত্র গেইলের সেঞ্চুরিই পারে রংপুরকে জেতাতে।’ পরিস্থিতির দাবি মেটাতে যা দরকার, ঠিক সেটাই তো করলেন গেইল। ৪৫ বলে সেঞ্চুরি, ৫১ বলে ১২৬ রানের ইনিংসে ১৪টি ছক্কা। তাতেই ভেঙে খান খান বিপিএলের অনেক রেকর্ড আর খুলনা টাইটানসের জয়ের স্বপ্ন।
১৫ নভেম্বর ঢাকার উদ্দেশে বিমানে চড়ার আগে টুইটারে লিখেছিলেন, ‘আরেকটা ছবিতে অভিনয় করতে বাংলাদেশে যাচ্ছি।’ গেইল যে  ‘ছবি’তে থাকবেন, সেটা হবে চার আর ছক্কার অ্যাকশনে ভরা—এমনটাই তো দর্শকের প্রত্যাশা। কিন্তু গ্রুপ পর্বের ম্যাচে যেন ঠিকঠাক জমছিল না ‘অ্যাকশন’; সব যেন ছুতোরের ঠুকঠাক, কামারের ঘা নয়; কিন্তু ‘এলিমিনেটর’ ম্যাচেই ‘টার্মিনেটর’ ছবির আর্নল্ড শোয়ার্জনেগারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন গেইল। তাঁর ব্যাট ছুঁয়ে বাউন্ডারির বাইরে আছড়ে পড়া একেকটি ছয়ের মার ভাঙতে লাগল খুলনা টাইটানসের স্বপ্নের সৌধ। গেইলের ‘গেইলসুলভ’ ইনিংসেই টানা দ্বিতীয়বারের মতো এলিমিনেটর ম্যাচে এসে যাত্রা থেমে গেল খুলনা টাইটানসের। দুবারই তরুণ খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া দল নিয়ে, টিম স্পিরিটে ভর করে খুলনা ভালোভাবেই নিশ্চিত করে শেষ চার; কিন্তু সেখান থেকে শিরোপার লড়াইয়ে যাওয়ার সৌভাগ্য তাদের গতবারও হয়নি, এবারও হলো না। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ক্রিস গেইলের ১৯তম সেঞ্চুরি কেড়ে নিল সেই স্বপ্ন। মাহমুদ উল্লাহ রিয়াদ তাই খানিকটা দুর্ভাগাই ভাবছেন নিজেকে, ‘সবাই জানে সেট হয়ে গেলে ও (গেইল) কতটা ভয়ংকর। দ্রুত উইকেট না নিলে ওর মতো খেলোয়াড়কে আটকানোটা অনেক কঠিন। আমরা দ্রুত ওকে আউট করতে পারিনি।’
মিরপুরের অসমান বাউন্সের উইকেটে ১৬৮ রান তাড়া করে জেতার ম্যাচে ৫১ বলে অপরাজিত ১২৬ রানের ইনিংস, অর্থাৎ দলের মোট রানের বেশির ভাগই এসেছে গেইলের ব্যাট থেকে। ১৪ ছক্কা আর চার বাউন্ডারি; ৮৪ আর ১৬ মিলে ১০০ রান নিয়েছে জায়গায় দাঁড়িয়ে স্রেফ ১৮ বল থেকে! এমন সব চোখ কপালে তোলা পরিসংখ্যান দিয়েই সাজানো ২০১৭ বিপিএলের প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র সেঞ্চুরিটি। এমনিতেই বিপিএলে সর্বোচ্চ সেঞ্চুরির রেকর্ড গেইলের, সেটাই তিন থেকে বাড়িয়ে চার করেছেন। নিজের এক ইনিংসে ১২ ছক্কার রেকর্ড নিজেই ভাঙলেন ১৪ ছক্কায়। সেবার গায়ে ছিল ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটরসের জার্সি, অধিনায়ক ছিলেন মাশরাফি বিন মর্তুজা। এবারও অধিনায়ক মাশরাফি, শুধু দলের নামটা বদলে হয়েছে রংপুর রাইডার্স। দুইবার এমন ইনিংস অধিনায়ক হিসেবে ডাগআউট থেকে দেখাটা বড় ভাগ্য বলছেন মাশরাফি, ‘আমি খুব ভাগ্যবান যে আমি অধিনায়ক থাকতে ও এমন দুটি ইনিংস খেলল। একটা সিলেটের সঙ্গে, ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটরসে যেটা খেলেছিল। আর এটা খেলল। গেইলের মতো ক্রিকেটারের ওপর খানিকটা দ্বিধা জন্মালেও বিশ্বাসটা থাকে যে ওর যা পাওয়ার তাতে মিস হিটও সীমানার বাইরে চলে যাবে।’ অধিনায়ক হিসেবে কাছ থেকে গেইলকে দেখার অভিজ্ঞতা থেকে মাশরাফি জানালেন, মাঠে ঝড় তুললেও মাঠের বাইরে খুবই শান্ত গেইল, ‘যতটুকু দেখেছি খুব রিল্যাক্সড থাকতে পছন্দ করে। ও সব সময় রুমে ঘুমাতে পছন্দ করে, এটাই হয়তো মাঠে ওকে রিল্যাক্সড রাখে। ও সব সময় শান্ত থাকে, আস্তে আস্তে তৈরি হয়ে মাঠে নামে। কখনো তাড়াহুড়া করে না।’
এ রকম শান্ত ধীরস্থির মনোভাব নিয়েই বোলারদের ওপর চড়াও হন গেইল। যেদিন ব্যাটে-বলে হয়ে যায়, সেদিন প্রলয়! আর এলিমিনেটরের মতো বাঁচা-মরার ম্যাচে গেইলের এমন পারফরম্যান্সই যে শিরোপার লড়াইয়ে ফিরিয়ে আনল রংপুরকে, সেটাও মেনে নিলেন মাশরাফি, ‘কাউকে ছোট করা না, গেইল আউট হয়ে গেলে এই ম্যাচ খুব কঠিন হয়ে যেত। আমরা ভাগ্যবান, গেইল স্টেপ-আপ করেছে।’ আর এ রকম বাঁচা-মরার ম্যাচে একাই ব্যবধান গড়ে দিতে পারেন বলেই তো তিনি ‘ইউনিভার্স বস’

Copyright © 2020 Sayem Sobhan Anvir. All Rights Reserved.