Pre-loader logo

গেইল ধামাকায় খুলনার বিদায়

গেইল ধামাকায় খুলনার বিদায়
স্পোর্টস রিপোর্টার ॥ সঠিক সময়ে জ্বলে উঠলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের দানবীয় ব্যাটসম্যান ক্রিস গেইল। হারলেই বিদায়। এমন ম্যাচে এসে দেখিয়ে দিলেন নিজের ঝলক। এমনই ব্যাটিং ধামাকা দেখালেন রংপুর রাইডার্সের এ ওপেনার, তাতে খুলনা টাইটান্সের বিদায় ঘণ্টা বেজে গেল। গেইলের অপরাজিত ১২৬ রানে ৮ উইকেটে জিতল রংপুর। তাতে করে ফাইনালে খেলার আশা জিইয়ে রাখল রংপুর। রবিবার দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ারে জিতলেই শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে খেলা নিশ্চিত করবে রংপুর।
মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে এলিমিনেটর ম্যাচটিতে রংপুর টস জিতে। আগে ফিল্ডিং করার সিদ্ধান্ত নেয়। টি২০ স্প্যাশালিস্ট ব্যাটসম্যানে ভরা। তাই আগে ফিল্ডিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রংপুর। যদি খুলনাকে কম রানে বেঁধে ফেলা যায়। এরপর টার্গেট অতিক্রম করে জেতা যায়। খুলনা সেই সুযোগটি দেয়নি রংপুরকে। ৬ উইকেট হারিয়ে ২০ ওভারে ১৬৭ রান করে। ব্যাটসম্যানদের ঐক্যবদ্ধ নৈপুণ্যে ১৭০ রানের কাছে যেতে পেরেছে খুলনা। পাঁচ ব্যাটসম্যান ২০ রান বা তার উর্ধে করেছেন। এর মধ্যে আরিফুল হক সবচেয়ে বেশি ২৯ রান করেছেন। নিকোলাস পুরান করেছেন ২৮ রান। কার্লোস ব্রেথওয়েটের ব্যাট থেকে এসেছে অপরাজিত ২৫ রান। মাইকেল ক্লিনজার ২১ ও মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ ২০ রান করেছেন। বড় স্কোর হয়নি। তবে ব্যাটসম্যানরা ব্যাটিংয়ে এসে যে অবদান রেখেছেন তাতেই খুলনার স্কোর বড় হয়েছে। উইকেট যেভাবে আচরণ করছে তাতে এই স্কোরও বিশাল! কিন্তু এক গেইলই বুঝিয়ে দিলেন, এই রানও কোন বিষয় নয়। তিনি যেদিন খেলেন, সেদিন শুধু তাকে নিয়েই আলোচনা করতে হয়। রেকর্ড ১৪টি ছক্কার সঙ্গে ৬টি চার হাঁকিয়ে অপরাজিত ১২৬ রান করে গেইল তা বুঝিয়েও দিলেন। এমন ব্যাটিংয়ের পর কী আর সহজভাবে না জেতা যায়? রংপুর সহজ জয়ই পেল। ২ উইকেট হারিয়ে ১৫.২ ওভারে ১৭১ রান করে জিতল রংপুর। ম্যাচের নায়ক হলেন গেইল। শুরু থেকেই ক্রিস গেইল ধামাকা দেখা যায়। ছক্কা-চার হাঁকাতে থাকেন। কিন্তু উইকেটও হারাতে থাকে রংপুর। একদিকে গেইল আঁকড়ে থাকেন। আরেকদিকে ২৫ রানেই ২ উইকেট হারিয়ে বসে রংপুর। সোহাগ গাজীকে ওপেনিংয়ে নামানো হয়। ব্যর্থ হন। ব্রেন্ডন ম্যাককালাম তো ব্যর্থতার ধারা বজায় রেখেছেনই। গেইল ঠিকই নিজের ধামাকা ব্যাটিং চালিয়ে যেতে থাকেন। গেইলের সঙ্গে মোহাম্মদ মিঠুন সঙ্গ দিতে থাকেন। ২৩ বলে হাফ সেঞ্চুরি করে ফেলেন গেইল। রংপুরের রানও স্কোর বোর্ডে দ্রুতই বাড়তে থাকে। কোন বোলারকেই গেইল ছাড় দেননি। যিনিই বোলিং করতে এসেছেন, গেইলের ব্যাটিং তা-বের শিকার হয়েছেন। গেইলের এমন ব্যাটিংয়ে উৎসাহ পেয়ে মিঠুনও বাউন্ডারি হাঁকাতে থাকেন।

মোহাম্মদ ইরফানের করা নবম ওভারের দ্বিতীয় বলে স্লোগ সুইপ করে ডিপ মিডউইকেট দিয়ে যে ছক্কা হাঁকান গেইল, সেটি টুর্নামেন্টের সবচেয়ে দীর্ঘতম ছক্কা হয়ে যায়। সেই ওভারের পঞ্চম বলেই ৭১ রানে থাকা গেইলের ক্যাচ মিস। লং অনে ক্যাচ আউট হওয়া থেকে বাঁচেন গেইল। সঙ্গে বলটি নো বলও হয়। ফ্রি হিটে ক্যাচ আউট হয়েও বেঁচে যান গেইল। ১০ ওভারেই ১০৪ রান হয়ে যায় রংপুরের। গেইলের ততক্ষণে ৩৫ বলে ৭৩ রান হয়ে যায়। কি ধুন্ধুমার ব্যাটিংটাই না করতে থাকেন গেইল। দুইবার আউট হওয়ার সম্ভাবনা থেকে বাঁচায় ব্যাটই পরিবর্তন করেন। নতুন ব্যাট নিয়ে আরও বিধ্বংসী হয়ে ওঠেন গেইল। ৪৫ বলে গিয়ে সেঞ্চুরিও করেন। ১০টি ছক্কা ও ৬ চারে সেঞ্চুরি করেন গেইল। তার এই ধামাকা ব্যাটিং দেখার অপেক্ষাতেই ছিলেন ক্রিকেটপ্রেমীরা। গেইল শেষ পর্যন্ত তা দেখালেন। তার এই ব্যাটিংয়ে জ্বলে পুড়ে গেল খুলনা, খুলনার ক্রিকেটাররা। গেইল আবার বিপিএলে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ইনিংসও করে ফেললেন। ১৪টি ছক্কা ও ৬টি চারে ৫১ বলে অপরাজিত ১২৬ রানের ইনিংস খেলেন। গত বিপিএলের সাব্বির রহমান রুম্মন ১২২ রান করেছিলেন। যা বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বিপিএলের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস ছিল। গেইল এখন সেরা হয়ে গেলেন। এই রানে অনায়াসে জিতল রংপুরও। ফাইনালে ওঠার স্বপ্নও জিইয়ে রাখল।
মোহাম্মদ মিঠুনও দুর্দান্ত ব্যাটিং করলেন। অপরাজিত ৩০ রান করলেন। গেইলের সঙ্গে তৃতীয় উইকেট জুটিতে ১৪৬ রানের জুটি গড়লেন। যা বিপিএলে তৃতীয় উইকেট জুটিতে রেকর্ড হয়েছে। রেকর্ড জুটিতে রংপুর এখন দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ারে খেলাও নিশ্চিত করল। দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ার ম্যাচটি জিতলেই ফাইনালে উঠে যাবে রংপুর। শুধু কি গেইলের সঙ্গে রেকর্ড জুটির সঙ্গী হলেন মিঠুন, যেভাবে গেইলকে বারবার এক রান নিয়ে খেলার সুযোগ করে দিলেন, তাও প্রশংসা কুড়িয়েছে। গেইল ১১৪ রানে ছিল। তখন জিততে রংপুরের ৯ রান দরকার ছিল। বিপিএলের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোর ছিল সাব্বিরের। এমন মুহূর্তে মিঠুন রানই নিলেন না। গেইলকে বিপিএলে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ ইনিংস করার সুযোগ দিলেন। তাতে ৯টি রানই গেইলকে নিতে হতো। গেইল টানা দুই বলে দুই ছক্কা হাঁকিয়ে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড গড়ার সঙ্গে দলকেও জিতিয়ে মাঠ ছাড়লেন।
খুলনা অবশ্য বড় কোন জুটি গড়তে পারেনি। পঞ্চম উইকেটে আরিফুল ও পুরান মিলে যে ৪০ রানের জুটি গড়েছেন এটিই বড় জুটি। এর আগে ২১ রানে প্রথম, ৩৪ রানে দ্বিতীয় ও ৫৬ রানে তৃতীয় উইকেট হারিয়েছে খুলনা। শান্ত, ধ্রুব ও মাহমুদুল্লাহ’র উইকেট হারিয়ে বিপাকেও পড়েছিল। সেখান থেকে ক্লিনজার ও আরিফুল মিলে দলকে ৮২ রানে নিয়ে যান। একটু এগিয়ে দেন। এমন সময়ে ক্লিনজার আউট হতেই পুরান ব্যাট হাতে নেমেই ধুমধাড়াক্কা ব্যাটিং শুরু করে দেন। উপায়ও যে ছিল না। রংপুরের যে শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপ, জয় পেতে হলে বড় স্কোর গড়তেই হবে। নয়তো আগেই হার হওয়ার সম্ভাবনা জেগে যাবে। আরিফুল ও পুরান মিলে দুর্দান্ত খেলতে থাকেন। দু’জন মিলে সমানতালে এগিয়ে যেতে থাকেন।

দল ১০০ রানও দ্রুতই অতিক্রম করে ফেলে। ১২২ রান যখন হয় তখন আরিফুলকে সাজঘরে ফেরান পেসার রুবেল হোসেন। এই দু’জন যে তালে ব্যাটিং করছিলেন তাতে আরও বড় স্কোর হওয়ার সম্ভাবনাই জেগে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত আরিফুল আউট হওয়াতে সেই সম্ভাবনায় ভাটা পড়ে। তাতেও দমে যাননি পুরান। ব্যাট হাতে নৈপুণ্য দেখাতেই থাকেন। তার সঙ্গে ব্রেথওয়েট যোগ দিয়ে রানের গতিকে আরও চাঙ্গা করে তোলেন। দু’জন মিলে দলকে ১৫৫ রানে নিয়ে যান। এমন সময়ে লাসিথ মালিঙ্গার বলে কোন কিছু বুঝতে না পেরে এলবিডব্লিউ আউট হয়ে যান পুরান। এরপর আর কোন উইকেট হারায়নি খুলনা। শেষে ব্রেথওয়েটের দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে ১৬৭ রানে যায় খুলনা। কিন্তু তাতে কাজ হয়নি। গেইল যেদিন ব্যাট হাতে জ্বলে ওঠেন, সেদিন কী আর প্রতিপক্ষ দল জিততে পারে! গেইল ধামাকায় তাই খুলনার বিদায় ঘটল।
স্কোর ॥ রংপুর-খুলনা এলিমিনেটর ম্যাচ মিরপুর
খুলনা টাইটান্স ইনিংস ১৬৭/৬; ২০ ওভার (শান্ত ১৫, ক্লিনজার ২১, আফিফ ১১, মাহমুদুল্লাহ ২০, আরিফুল ২৯, পুরান ২৮, ব্রেথওয়েট ২৫*, আরচার ৬; মালিঙ্গা ২/৪৯, বোপারা ১/১৫)।
রংপুর রাইডার্স ইনিংস ১৭১/২; ১৫.২ ওভার (গেইল ১২৬*, সোহাগ ১, ম্যাককালাম ০, মিঠুন ৩০*; আরচার ২/৩০)।
ফল ॥ রংপুর রাইডার্স ৮ উইকেটে জয়ী।
ম্যাচসেরা ॥ ক্রিস গেইল (রংপুর রাইডার্স)।

Copyright © 2020 Sayem Sobhan Anvir. All Rights Reserved.