Pre-loader logo

দাপটে ফাইনালে রংপুর রাইডার্স

দাপটে ফাইনালে রংপুর রাইডার্স

মালিকানা হাতবদল হয়ে বসুন্ধরা গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান-২ সাফওয়ান সোবহানের হাতে আসতে আসতে অনেক দেরি হয়ে যায়। তত দিনে বাকি ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর দল গোছানো প্রায় শেষ। তাই কুড়িয়ে বাড়িয়ে গড়া রংপুর রাইডার্স যেন টানাটানির সংসার! কিন্তু দিন যত গড়িয়েছে ততই গোছানো দলে পরিণত সেই রংপুর গতকাল গ্রুপ পর্বের সেরা দল কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানসকে ৩৬ রানে হারিয়ে বিপিএলের পঞ্চম আসরের ফাইনালে উঠেছে। আজ মিরপুরের ‘হোম অব ক্রিকেটে’ ঢাকা ডায়নামাইটসের বাধা টপকাতে পারলে ‘প্রথম’ আসরেই বাজিমাত রংপুর রাইডার্সের। নতুন মালিকানায় এ তো ‘নতুন’ রংপুরই!
এত দিন রংপুরের ব্যাটিং মানেই ক্রিস গেইলকে ঘিরে প্রতিপক্ষের যত পরিকল্পনা। তিনি এই ম্যাচে ‘ফ্লপ’ গেলেও আরেক ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান জনসন চার্লস আর দীর্ঘ ‘হাইবারনেশন’ থেকে জেগে ওঠা ব্রেন্ডন ম্যাককালামের ঝোড়ো ব্যাটিংয়ে যে ইনিংস গড়ে, তাতে আপাতদৃষ্টিতে ম্যাচটা রংপুরের দিকেই ঝুঁকে পড়ে। তবে টি-টোয়েন্টিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। জয়ের জন্য ১৯৩ রানের লক্ষ্য নিয়ে নামা কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানসের ব্যাটিংয়ে যেন তারই পূর্বাভাস। অধিনায়ক তামিম ইকবালের সতর্কতার সঙ্গে আক্রমণ এবং লিটন দাসের অলআউট আক্রমণে পঞ্চম ওভারেই বিনা উইকেটে ৫০ তুলে ফেলে ভিক্টোরিয়ানস। অবশ্য প্রতিপক্ষের এই ঊর্ধ্বশ্বাস ছোটায় রংপুর রাইডার্স ফিল্ডারদেরও কম অবদান নেই! একটি ক্যাচ আর দুটি পরিষ্কার রান আউটের সুযোগ নষ্ট করেছেন নাহিদুল ইসলাম ও নাজমুল ইসলাম মিলে। আবার আম্পায়ারের ভুলের ক্ষতিও সইতে হয়েছে রংপুর রাইডার্সকে, তামিমের বিপক্ষে জোরালো এলবিডাব্লিউর আবেদন যে অগ্রাহ্য হয়। তবে সেই ক্ষতিপূরণ খুব চড়া দামে দিতে হয়নি রাইডার্সকে। পুরো আসরে দুর্দান্ত বোলিং আর উজ্জীবিত নৈপুণ্যে দলকে বয়ে বেড়ানো মাশরাফি বিন মর্তুজাকে ক্যাচ দিয়ে তামিমের ফেরার মধ্য দিয়ে ভিক্টোরিয়ানস দুর্গের পতনের শুরু। লিটন আশার ভেলা হয়ে টিকেছিলেন ১২ ওভার পর্যন্ত। কিন্তু ততক্ষণে উন্মুক্ত হয়ে পড়া ভিক্টোরিয়ানসের ব্যাটিং সম্ভাবনা প্রায় নিভু নিভু লিটনের বিদায়ে। সেই বাতি একেবারে নিভতেই যা একটু সময় লেগেছে ভিক্টোরিয়ানসের ইনিংসের শেষ ওভারে, যদিও এই ভবিতব্য একরকম জানা হয়ে গিয়েছিল লিটনের বিদায়ের মধ্য দিয়েই।
ব্যাটিংয়ে নড়বড়ে হলেও খুব কম ম্যাচেই ব্যর্থ হয়েছে রংপুর রাইডার্সের বোলিং। গতকালও নিজেদের কাজটা যথাযথভাবে পালন করেছেন মাশরাফি অ্যান্ড কম্পানি। ছয় বোলারের সবাই-ই উত্তীর্ণ কৃতিত্বের সঙ্গে। এর মধ্যে রুবেল হোসেন রান কিছু বেশি দিয়েছেন বটে, তবে দলের জয় নিশ্চিত হয়েছে তাঁর ওভারেই। মাশরাফির বোলিং ইউনিটে ‘আনসাং হিরো’ অবধারিতভাবে কাল ৩৪ রানে ৩ উইকেট নেওয়া রুবেল হোসেন। সোহাগ গাজী, নাজমুল ইসলাম, রবি বোপারা, ইসুরু উদানা—প্রত্যেকেই অবদান রেখেছেন দলের উত্তরণে।
ওদিকে ব্যাট তাঁর কথাই বলছিল না! অথচ মারকাটারি ব্যাটিংয়ের জন্য ব্রেন্ডন ম্যাককালামের সুনাম দুনিয়াজুড়ে। তবে কি বয়সের ভারে নেতিয়ে গেছে তাঁর ব্যাট? এই ধারণা চূড়ান্ত প্রতিষ্ঠা পাওয়ার আগেই জ্বলে উঠলেন ম্যাককালাম। জনসন চার্লসের ৬৩ বলে অপরাজিত ১০৫ রানের ইনিংস যদি রংপুর রাইডার্সের উড়ান হয়, তাহলে সাবেক কিউই অধিনায়কের ৪৬ বলে ৭৮ রান সেটির জ্বালানি। এই দুই বিদেশির ১৫১ রানের জুটি শুধু তাঁদের ফ্র্যাঞ্চাইজিকেই তুষ্ট করেনি, মন ভরিয়েছে টি-টোয়েন্টি দর্শকদেরও।
অথচ রংপুর রাইডার্সের ‘দ্বিতীয়’ শুরুটা হয়েছিল ঢিমেতালে। আগের দিন টস হেরে ব্যাটিংয়ে নামা মাশরাফি বিন মর্তুজার দলের ইনিংস সপ্তম ওভার পর্যন্ত গড়াতেই বৃষ্টির কারণে বন্ধ হয়। অনেক নাটকীয়তার পর সেই ম্যাচের বাকি অংশ শুরু হয় গতকাল সন্ধ্যায়। এই ম্যাচের প্রথম দিনে ক্রিস গেইলকে অল্পতে হারালেও তাঁর উদ্বোধনী সঙ্গী জনসন চার্লসের ব্যাটে রক্ত চলাচল সচলই ছিল রংপুর রাইডার্সের। তবে মাঝের এক রাতের বিরতির কারণে কাল নতুন শুরুটা সতর্কভাবেই করতে হয়েছে চার্লসকে। আরেক প্রান্তে বাংলাদেশের ধীরগতির উইকেটের সঙ্গে পরিচিত হতে হতেই বিপিএলের শেষ প্রান্তে ম্যাককালাম মহাসতর্ক। তাতে ৭ ওভারে ৫৫ রান নিয়ে দিন শুরু করা রাইডার্স ৯ ওভারে ৬১ মোটে।
এরপরই শুরু তাণ্ডবের, দুই প্রান্ত থেকে। জিম্বাবুয়ের লেগ স্পিনার গ্রায়েম ক্রেমার দিনের শুরুটা ভালোই করেছিলেন, দিয়েছিলেন ৩ রান। কিন্তু তাঁর পরের ওভারেই উঠল ১৭ রান। চার্লস আর ম্যাককালাম; দুই জনেরই একটা করে ছক্কায়। এরপর কুমিল্লার পাকিস্তানি পেসার হাসান আলী ছাড়া আর কোনো বোলারই রেহাই পাননি চার্লস-ম্যাককালাম জুটির কাছে। ক্রেমার আর আল আমিন হোসেনের ওপর দিয়েই ঝড়-ঝাপ্টা গেছে বেশি। মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন কিংবা মেহেদী হাসানের বোলিং ফিগারও তাঁদের দলের উদ্বেগের কারণ ঘটিয়েছে।
অবশ্য বিনোদনের ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে কোনো একটি দলের দুর্দশা নিয়ে ভাবতে বয়েই গেছে দর্শকের! বরং জনসন চার্লসের আকাশছোঁয়া ছক্কা আর ট্রেডমার্ক ‘ফোরহ্যান্ড’ শটে এক্সট্রা কাভার দিয়ে ম্যাককালামের ফ্ল্যাট ছক্কাগুলো উপভোগ করেছে গ্যালারির দর্শক। নিজের খেলা প্রথম ১০ বলে মাত্র ৬ রান করা ম্যাককালাম স্ট্রাইক রেট বাড়িয়েছেন একটি বাউন্ডারির সঙ্গে ৯ ছক্কায়। এবারের আসরের দ্বিতীয় সেঞ্চুরিয়ান চার্লসের ইনিংসে বাউন্ডারি আর ছক্কার সংখ্যায় ব্যবধান খুব বেশি নয়, যথাক্রমে ৯ ও ৭। উল্লেখ্য, দুই সেঞ্চুরিয়ানই (গেইল ও চার্লস) ব্যাটিং নিয়ে আগের প্রায় প্রতিটা ম্যাচে ধুঁকতে থাকা রংপুর রাইডার্সের।
আজকের ফাইনালে ঢাকা ডায়নামাইটসের মনোজগতে এই ফুটনোট খোঁচা না দিয়ে পারেই না!

Copyright © 2021 Sayem Sobhan Anvir. All Rights Reserved.